“জয় বাংলা’ – মুক্তির শ্লোগান যখন যন্ত্রণার

This News is Presented by Shyam Sundar Jewellers

প্রবীর মিত্র : কিছু দিন আগেই আমাদের প্রতিবেশী রাস্ট্র বাংলাদেশ তাদের স্বাধীনতার গৌরবময় ৫০ বছর পূর্ণ করল। ১৯৭১ সাল ছিল একটি রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাসের বছর। পূর্ব পাকিস্তানকে নিজেদের ক্ষমতাসীন রাখার উদ্দেশ্যে পশ্চিম পাকিস্তানের অত্যাচারী পাক সেনারা নির্বিচারে বাংলাদেশের নিরীহ জনগণকে হত্যা, ধর্ষণ, লুট করে চলেছিল। প্রানভয়ে প্রচুর শরণার্থী একবস্ত্রে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের আহ্বানে পশ্চিম পাকিস্থানের এই অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল পূর্ববাংলার মুক্তিযোদ্ধাবাহিনী।

ছবি : ইন্টারনেট

তাঁদের একটি জনপ্রিয় শ্লোগান ছিল “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু”। সেই ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান ওপারের মুক্তির মন্ত্র হলেও এপারে অর্থাৎ পশ্চিমবাংলায় তা একটি সমস্যার সৃষ্টি করেছিল।

This news is sponsored by STP Tax Consultant

এপারে সেই ‘জয় বাংলা’ শব্দটি ছিল আতঙ্কের (হয়তো আজও)। একটি চোখের রোগ যাকে সাদা বাংলায় আমরা বলি ‘চোখ ওঠা’, (Conjunctivitis or pink eye)।

সেই সময় বিভিন্ন সংবাদপত্রের শিরোনামে ছিল এই ছোঁয়াচে রোগের কথা, তার সাথে অবশ্যই ডাইরিয়া। পশ্চিমবঙ্গবাসীর মনে (বিশেষত যারা ঘটি বলে খ্যাত) তখন একটা বধ্যমূল ধারণা হয়েছিল এই ‘চোখ ওঠা’ রোগের উৎপত্তি সুদূর বাংলাদেশ-এ এবং রোগটি পূর্ব বাংলায় চলা মুক্তিযুদ্ধের কারণে সীমান্ত পেরিয়ে চলে আসা শরণার্থীদের কারণেই ছড়িয়েছিলো এবং যেহেতু ‘জয় বাংলা’ ছিল সেইসময়ের একটা জনপ্রিয় আবেগের শ্লোগান তাই বাংলাদেশ থেকে আগত এই চোখের এই মহামারীর নামকরণও হয়ে গেল “জয় বাংলা”।

তবে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গবাসীরাই নয় এই চোখ ওঠা রোগে মুক্তিযোদ্ধারাও ভুগেছেন এবং ভুগেছে অত্যাচারী পাকিস্তানি সৈন্যরাও। পাকবাহিনীর ভোগান্তিটা একটু বেশি ছিল, কারণ তারা এই রোগের সাথে পরিচিত ছিল না। অনাকাঙ্খিত এই মহামারি কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুক্তিবাহিনীর গেরিলা যোদ্ধাদের কিছুটা সুবিধা এনে দিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধারা চোখ ওঠা রোগকে মজা করে বলতেন ‘জয় বাংলা রোগ’। এমনকি বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী এলাকায় যেসব অস্থায়ী হাসপাতালে আহত ও অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা দেয়া হত, সেখানকার ডাক্তাররাও কনজাংটিভাইটিসকে বলতেন ’জয় বাংলা রোগ’। আক্রান্তদের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা যেমন ছিলেন তার পাশাপাশি শরণার্থীরাও ছিলেন এবং সংক্রামক এই রোগের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন স্থানীয় অধিবাসীরাও। বিষয়টা এতোটাই বাড়াবাড়ির পর্যায়ে গিয়েছিল যে সমস্তপ্রকার যানবাহনও কিছুদিনের জন্য বাতিল করতে হয়েছিল এই বাংলাতে।

সেইদিনকার নবীন এবং আজকের প্রবীণ প্রজন্ম আজও হয়তো মনে করতে পারবেন সেই সময়কার সাময়িক লকডাউনের কথা। বন্ধ রাখা হয়েছিল স্কুল, কলেজ, অফিস এবং শুধু তাই নয় এই চোখ-ওঠা রোগের কারণে বাতিল করতে হয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল ম্যাচ। এই রোগ নিয়ে রসিকতা করতেও ছাড়েনি কোলকাতার তখনকার দৈনিক সংবাদ পত্রিকাগুলো। পাত্রী দেখতে গিয়ে পাত্রের চোখে চশমা। গোড়াতেই পাত্রীর প্রশ্ন. ‘চোখ উঠেছে’? চোখ-ওঠা নিয়ে যুগান্তর এ কাটুনিস্ট এঁকেছিলেন এমনই অনবদ্য এক কার্টুন।

নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের কাগজে লিখেছিল পশ্চিমবঙ্গে ৫০ লাখের উপর মানুষ এই রোগে আক্রান্ত এবং রেহাই পায় নি সাংবাদিক ও চিকিৎসা কর্মীরাও। তবে এটি কলেরা বা ডাইরিয়ার মতো প্রাণঘাতি না হলেও কয়েকটি দিন যেন বড্ড অস্বস্তিকর। চোখ লাল হয়ে যাওয়া, জ্বালা করা, করকর করা, চোখ দিয়ে অনবরত জল পড়া, স্লেশ্মা বেরোন ইত্যাদি। এর পাশাপাশি চোখে যাতে ধুলো না ঢোকে সেই জন্য চোখে আইড্রপ ছাড়াও দিতে হত পরিস্কার জল এবং পরে থাকতে হত একটি কালো স্নানগ্লাস ঠিক যেই রকম ছানি অপারেশন-এর পর পরতে হয়।

সেই সময় বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হোত নানা ধরনের টোটকা, যেমন ‘ছিলিমের (হুঁকো) বাসী জল চোখে ঝাপটা দিলে উপকৃত হইবেন। লেবুর রস, পেঁয়াজের রস, হাতিশুঁড়া পাতার রস, ঘন দুধের সর চোখে লাগাইলে বিশেষ উপকার পাইবেন ইত্যাদি সব টোটকা, জানিনা সেই সময় কেউ উপকৃত হয়েছিলেন কিনা? খবরের কাগজ জুড়ে থাকতো নানাধরনের তরল সাবান, আইড্রপ ইত্যাদির বিজ্ঞাপন।

সরকারি হিসেব অনুযায়ী ১৯৭১ সালের মার্চ মাস থকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ বিনামূল্যে অ্যাকিউট হেমারেজিং কনজাংটিভাইটিস-এর চিকিৎসা পেয়েছিলেন। বিভিন্ন পথসভায় পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন সিনিয়র চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. নীহার মুন্সি, ডা. অমল সেন, ডা. আই এস রায়, ডা. প্রকাশ ঘোষ, ডা. জলধর সরকার ও কলকাতা পৌরসভার স্ট্যান্ডিং হেলথ কমিটির চেয়ারম্যান ডা. বীরেন বসু জনসাধারণকে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে এই রোগে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে বিবৃতি দিতেন। এই রোগের পাশাপাশি ছিল ‘জয় বাংলা’ নামের নানারকম সস্তার সামগ্রী, যেমন, জুতো, সাবান, তেল, ছাতা, স্যান্ডো গেঞ্জি, লুঙ্গি ইত্যাদি মূলত এগুলি প্রথমে বিনামূল্যে শরনার্থীদের দেবার ব্যবস্থা করেছিল স্থানীয় প্রশাসন এবং পরে তা নামমাত্র দামে বিক্রি হতে থাকে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার আজ ৫০ বছর পরে কোলকাতা শহরে এই রোগটি থাকলেও “জয় বাংলা রোগ” নামটি আজ বিলুপ্তির পথে কিন্তু গ্রামাঞ্চলে আজও কারও চোখ উঠলে বলে “ওর জয় বাংলা” হয়েছে শোনা যায়। কোন এক বুদ্ধিজীবি নাকি একবার বলেছিলেন, “বাংলাদেশের পতাকায় যে সবুজের ভেতরে টকটকে লাল সূর্য দেখা যায়, সেরকমই এই রোগে চোখ টকটকে লাল হয়ে ওঠে বলেই হয়তো একে এখনও জয় বাংলা বলে”।

ওপার বাংলা থেকে একবস্ত্রে চলে আসা শরণার্থীদের ঢল নেমেছিল এপার বাংলায়।
নিজভূম থেকে উৎপাটন হবার করুন ছবি
সংবাদপত্রে প্রকাশিত জয় বাংলা রোগের ওষুধের একটি বিজ্ঞাপন একটি ওষুধ কোম্পানির
সংবাদপত্রে প্রকাশিত জয় বাংলা রোগের ওষুধের একটি বিজ্ঞাপন একটি ওষুধ কোম্পানির
রেল পরিষেবাও বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছিল একটা সময় (যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত)
যুগান্তরে প্রকাশিত হওয়া সেই কার্টুন

(তথ্যঋণ ও ছবি – আনন্দবাজার আর্কাইভ, সৃষ্টির একুশ শতক বিশেষ স্বাধীনতা ৫০ সংখ্যা, রোর পোর্টাল)

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলন। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য ‘নিউজ ইন্ডিয়া প্রেস’ কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না। এর দায় সম্পূর্ণই লেখকের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

5 × 5 =