রঘু ডাকাতের কালী পূজা

This News is Presented by Shyam Sundar Jewellers

দেবব্রত সেনগুপ্ত : 

“তিলেক দাঁড়া ওরে শমন, বদনভরে মাকে ডাকি।
আমার বিপদকালে ব্রহ্মময়ী, এলেন কি না এলেন দেখি।।
লয়ে যাবি সঙ্গে করে, তার এত ভাবনা কিরে,
তবে তারা নামের কবচমালা বৃথাই আমি গলায় রাখি।”

– রামপ্রসাদের গলায় এই গানে যখন ঝরে পড়ছে ভক্তি সুধা, তখন রঘু ডাকাত দেখলেন হাড়িকাঠে রামপ্রসাদের বদলে স্বয়ং মা কালী। কিংবদন্তি মহাপুরুষ সম্পর্কে এই জনশ্রুতি বহুল চর্চিত। তৎক্ষণাৎ মাতৃভক্ত রামপ্রসাদ সেনকে মুক্ত করে রঘু ডাকাত এবং সসম্মানে এই মহাপুরুষের ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন।

This news is sponsored by STP Tax Consultant

মাকালীর পরম ভক্ত ছিলেন রঘু ডাকাত নিজেও। মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতা এই বিশাল অঞ্চলে একাধিক মন্দিরের সাথে রঘু ডাকাতের নাম জড়িত।

পরাক্রমশালী রঘু ডাকাত শোল মাছ পোড়া এবং নরবলি দিয়ে মাকে তুষ্ট করে ডাকাতি করতে যেতেন। রঘু ডাকাতের নামে তখন থরহরি কম্প জমিদার থেকে জোরদার সবারই। রঘু ডাকাতের এলাকায় আক্রমণ থেকে বাদ যায়নি নীলকর সাহেবরাও।

শোনা যায় সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ছিলেন অনেকটা রবিনহুড এর মতই। গরিব নিম্নবিত্ত মানুষ তাকে দেব জ্ঞানে শ্রদ্ধা করত। মায়ের পায়ে অস্ত্র ছুঁইয়ে সাফল্যের প্রার্থনা করত রঘু।

জনশ্রুতি এই প্রথা আজও বহন করে চলেছে রঘু ডাকাতের বংশধর। রঘু ডাকাতের প্রতিষ্ঠিত কালী মন্দিরে রাতের অন্ধকারে হঠাৎই কোথা থেকে উদিত হয় তারা। কাপড়ের কোচোর থেকে আগ্নেয়াস্ত্র বার করে ছুঁইয়ে নিয়ে যায় মায়ের পায়ে। আবার নাকি পলকেই মিশে যায় জনস্রোতে। যারা বুঝতে পারে তারা একটু সমঝে চলে ঘুর বংশধরদের।

রঘু ডাকাত এবং তার ভাই বুধো ডাকাত সম্পর্কে মানুষের ধারণা বেশ ভালো ছিল। কালীভক্ত এই ডাকাত ভাইরা চিঠি দিয়ে ডাকাতি করতে যেত। এবং ডাকাতির সময় মহিলাদের” মা বলে সম্মান করতো এবং কোনরূপ অত্যাচার করত না। তারা গয়নাও স্বহস্তে খুলে নিত না। জনশ্রুতি অনুযায়ী রঘু ডাকাতের প্রতিষ্ঠিতকালী মন্দির ত্রিবেণীর বাসুদেবপুরের ডাকাত কালী নামে খ্যাত। ত্রিবেণী ঘাটের এক কিলোমিটারের মধ্যে দুটি প্রধান রাস্তার সংযোগস্থলের পাশেই জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে রয়েছে এই ডাকাত কালীর মন্দির। বাসুদেবপুরের রঘু ডাকাত আর বুধো ডাকাত এই মন্দিরে পুজো দিয়ে ডাকাতি করতে যেতেন। ডাকাতের আরাধ্যা দক্ষিণা কালী ।মন্দিরের গঠন অনেকটা গম্বুজাকার, এক চূড়া যুক্ত, এবং সামনে বিশাল চাতাল। মন্দিরের পিছনে রয়েছে একটি পুকুর ।কথিত আছে ডাকাতরা এই পুকুরে স্নান সেরে পুজো দিত ।

এছাড়াও বারাসাতের কাজীপাড়া অঞ্চলে রঘু ডাকাতের প্রতিষ্ঠিত একটি মন্দির আছে ।মন্দিরটি প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো। এই মন্দিরেই রঘু ডাকাত তাঁর আরাধ্যা দেবীর পূজা করতেন বলে লোকমুখে চর্চিত। তিনি অষ্টধাতুর কালী মূর্তির পূজা করতেন। শোনা যায় একবার রঘু ডাকাতের কিছু সঙ্গী ধরা পড়ে গেলে রাগে অন্ধ হয়ে গিয়ে রঘু মাকে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করেন। পরবর্তীকালে এই মূর্তি চুরি হয়ে যায়। এখন মন্দিরটি একটি বিশাল আকার গাছের শিকড়ে আবিষ্ট এক ভগ্নস্তূপ প্রায়। কালীপুজোর দিন এলাকাবাসী এখানে পুজোর ব্যবস্থা করেন।

বর্তমান কলকাতার চিতপুরেও রঘুর প্রতিষ্ঠিত কালী মন্দির রয়েছে। রঘু ডাকাতের আমলের প্রচলিত শোল মাছ পোড়া প্রসাদ পেতে এখানে বহু ভক্তবৃন্দের সমাগম হতো ।

এছাড়াও দক্ষিণ কলকাতার মনোহর ডাকাতের প্রতিষ্ঠ মন্দিরের সাথে মিশে আছে রঘু ডাকাতের নাম। এখানেও মাকে পুজো করেছিলেন রঘু ডাকাত।

আজ সেই জঙ্গল নেই । নেই রঘু ডাকাতের চিহ্ন। রয়েছে ভক্তের আরাধ্যা মায়ের মন্দির। রয়েছে নিয়মিত পুজোপাঠের ব্যবস্থা।তার সাথে মিশে আছে গা ছমছম রোমহর্ষক ডাকাতের গল্প।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

nine − 2 =