তিতুমীরের কৃষক বিদ্রোহ হয়ে ওঠে স্বাধীনতা সংগ্রামের দিশারী

ছবি-সংগৃহীত
This News is Presented by Shyam Sundar Jewellers

দেবব্রত সেনগুপ্ত:  পৃথিবীর ইতিহাসে অত্যাচারিত, নিপীড়িত ,হতদরিদ্র মানুষের সংগঠিত বিদ্রোহ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে। কখনো বিদ্রোহের রূপরেখা দান করেছেন কোন সুদৃঢ় নেতা । আবার অনেক সময় ছন্নছাড়া বিদ্রোহ সাময়িক স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করলেও দাবানল হতে পারেনি।

 

This news is sponsored by STP Tax Consultant

 

ইংরেজ আমলে বাঁশেরকেল্লার যুদ্ধ ছিল শাসক তথা শোষণকারীদের বিরুদ্ধে সংগঠিত সশস্ত্র কৃষক আন্দোলন। নিষ্পেষিত নিরন্ন কৃষিজীবী মানুষের দেয়ালে যখন পিঠ ঠেকে যায়, তখনই সেখানে জন্ম হয় কোন এক মহান নেতার। এগিয়ে আসে তিতুমীররা। তৈরি হয় বাঁশেরকেল্লা।

এই বিদ্রোহকে অনেকে ধর্মের মোড়কে মুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সহজেই অনুভব করা যায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে এত বড় লড়াই সমস্ত সাধারণ নিপীড়িত কৃষক সম্প্রদায়ের না হলে তা অনেক আগেই দ্রুত ভেঙে পড়তো। জমিদার এবং নীলকরদের তীব্র শোষণ নীতির বিরুদ্ধে মরিয়া হয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিল আপামর কৃষক সম্প্রদায়। উইলিয়াম হান্টার  উল্লেখ করেন, ঐ বিদ্রোহে প্রায় ৮৩ হাজার কৃষকসেনা তিতুমীরের পক্ষে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। বলাবাহুল্য এ লড়াইয়ে যুক্ত ছিলেন ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে সাধারণ কৃষক শ্রেণী।

মার খেতে খেতে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষেরা লাঠি হাতে রুখে দাঁড়িয়েছিল জমিদার এবং নীলকর সাহেবদের বাহিনীর বিরুদ্ধে। লড়াই যুগিয়েছিল অস্ত্র এবং দুর্গের প্রয়োজনীয়তার অনুভূতি।
মরিয়া হয়ে নিজেদের সুরক্ষার জন্য দরিদ্র মানুষ দ্রুত বাঁশ এবং কাদা দিয়ে নিজেদের সাধ্যমত একটি কেল্লা তৈরি করেন। ১৮৩১ সালের ২৩ অক্টোবর বারাসতের কাছে বাদুড়িয়ার ১০ কিলোমিটার দূরে নারিকেলবাড়িয়ায় বাঁশ এবং কাঁদা দিয়ে দ্বি-স্তর বিশিষ্ট এই কেল্লা প্রস্তুত করা হয়।

কোন কোন ঐতিহাসিক এই যুদ্ধকে ধর্মের গুরুত্বে বিভেদমূলক দৃষ্টিতে দেখলেও, ঐতিহাসিক অমলেন্দু দে মহাশয়ের ভাষায় তিতুমীরের লক্ষ্য ও পথ ছিল ইসলামে পূর্ন বিশ্বাস এবং হিন্দু কৃষকদিগকে সাথে নিয়ে ইংরেজ মদতপুষ্ট জমিদার ও নীলকরদের বিরোধিতা। তিতুমীরের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হিন্দুদের পাশাপাশি ধনী মুসলমানও ছিল। তার বক্তৃতা শোনার জন্যে দলে দলে হিন্দু মুসলিম কৃষক একত্রিত হতো। ঐতিহাসিক সুপ্রকাশ রায়ের ভাষায় তিতুমীরের এই সংগ্রাম ছিল প্রকৃত কৃষক বিদ্রোহ ,যার অভিমুখ ছিল অত্যাচারী জমিদার ও নীলকর সাহেবরা।

 

তিতুমীর ১৭৮২ সালের ২৭ জানুয়ারি (১৪ মাঘ ১১৮২ বঙ্গাব্দ) ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার চাঁদপুর (মতান্তরে হায়দরপুর) গ্রামে একটি শিয়া মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সৈয়দ মীর হাসান আলী এবং মায়ের নাম আবিদা রুকাইয়া খাতুন। তিতুমীর বর্তমান চব্বিশ পরগনা, নদীয়া এবং  ফরিদপুরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তার প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।

জনশ্রুতি শিশু বয়স থেকেই মীর নিষাদ আলীর অসম্ভব সহ্য শক্তি ছিল। শিশু বয়সে অসুস্থতার জন্য তাকে অত্যন্ত তিতো ওষুধ দেওয়া হয়। অত্যন্ত সহনশক্তি সম্পন্ন মীর শিশু বয়সেই হাসিমুখেই সেই ওষুধ দশ বারো দিন খেতে পেরেছিল। তাই প্রথমে তার নাম হয় তেতো, এরপর তিতু এবং সবশেষে তিতুর সঙ্গে মীর লাগিয়ে হয় তিতুমীরl

জীবনে প্রারম্ভিক ভাগে তিতুমীর পালোয়ান হিসেবে নাম ও খ্যাতি পায়। জানা যায় একসময় সে জমিদারের লাঠিয়াল হিসেবেও কাজ করেছে। কিন্তু তার অন্তরে ছিল মানবতা, অন্যায়ের প্রতিবাদে রুখে দাঁড়ানোর অদম্য মানসিক দৃঢ়তা। শিক্ষা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মানসিকতা তাকে দরিদ্র নিপীড়িত শোষিত কৃষক শ্রেণী পাশে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে প্রেরণা যোগায়। অত্যাচারী জমিদার ও নীলকর সাহেবরা বারংবার তার হাতে পরাজিত হয়। শেষ পর্যন্ত জমিদার এবং নীলকরদের প্ররোচনায় তৎকালীন প্রশাসকের ভূমিকায় থাকা ইংরেজ তার বিরুদ্ধে সৈন্য বাহিনী প্রেরণ করে।

এখানেই শুরু হয় ইংরেজ বাহিনীর বিরুদ্ধে পিঠ ঠেকে যাওয়া প্রতিবাদী কৃষক শ্রেণীর অসম সংগ্রাম। এই অসম সংগ্রাম প্রেরণা জোগায় পরবর্তী যুগে স্বাধীনতা সংগ্রামকে। ইংরেজদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়া তিতুমীর হয়ে ওঠেন স্বাধীনতা সংগ্রামের দিশারী।

১৮৩১ সালের ১৩ নভেম্বর ব্রিটিশ সৈন্যরা তাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। কামান ও আধুনিক অস্ত্র সজ্জিত ইংরেজ বাহিনীকে তিতুমীর তার স্থানীয় অস্ত্র দিয়ে প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়ে বাঁশের কেল্লায় আশ্রয় নেয়। ইংরেজরা কামানে গোলাবর্ষণ করে কেল্লা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে দেয়। তিতুমীরের বিপুল সংখ্যক সৈনিক প্রাণ হারায়। বহুসংখ্যক কৃষক যোদ্ধাসহ তিতুমীর যুদ্ধে শহীদ হন। সেই উল্লেখযোগ্য দিনটি ছিল ১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর। বাহিনীর অধিনায়ক গোলাম মাসুমসহ ৩৫০ জন বিদ্রোহী সৈনিক ইংরেজদের হাতে বন্দি হন। গোলাম মাসুম মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। ১৪০ জন বন্দিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তার বাহিনীর প্রধান মাসুম খাঁ বা গোলাম মাসুমকে ফাঁসি দেওয়া হয়। বাশেঁর কেল্লা গুঁড়িয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

14 + 4 =