হারানো শৈশবে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার খেলাধুলো

ছবি-বরুন দাস, নিউজ ইন্ডিয়া প্রেস
This News is Presented by Shyam Sundar Jewellers

“ওপেন টি বাইস্কোপ, নাইন টেন টেলিস্কোপ, 

সুলতানা বিবিয়ানা, সাহেব বাবুর বৈঠকখানা

This news is sponsored by STP Tax Consultant

সাহেব বলেছে যেতে পান সুপারি খেতে

পানের আগায় মরিচ বাটা, ইস্কাবনের চাবি আঁটা

যার নাম মনিমালা,তাকে দেবো মুক্তোর মালা…”

 

বরুন দাস: এই লাইন গুলো হয়তো অনেকের কাছেই চেনা লাগছে, আবার আজকের প্রজন্মের বাচ্চাদের কাছে এই লাইন গুলো হিব্রু মনে হতে পারে। তাদের মনে হতেই পারে, এসব আবার কী খেলা! এখন মোবাইল এর দৌলতে বাচ্চাদের কাছে হারিয়ে গেছে গ্রাম বাংলার এক সময়ের জনপ্রিয় খেলাধুলো।

 

আমরা যারা মধ্য বয়সী, তাঁরা স্মৃতির নুড়ি-পাথর হাতরে মাঝে মাঝেই পৌঁছে যাই আমাদের ফেলে আসা ছোটবেলায়, মনে পরে যায় ছোটবেলার বন্ধুদের কথা। কিছুক্ষণের জন্য হলেও উদাস হয়ে যাই। সময়ের বিবর্তনে সেই দিনগুলো আজ শুধুই স্মৃতি। দুরন্ত জীবন বর্ণ থেকে শব্দ হয়ে বাক্যগুলো গল্প হওয়ার প্রতিক্ষায় কীভাবে যেন হুট করে বড় হয়ে গেলাম।

 

ছোটবেলায় আমাদের যাদের ফুটবল কেনার সাধ্য ছিল না, তাদের বিকল্প উপায় ছিল পাশের বাড়ির গাছ থেকে পেরে আনা বাতাবী লেবু। খেলার উপকরণ যাই হোক না কেন, উৎসাহে ভাটা পরে নি কোনও দিন। কখনো একটা সাইকেল এর টায়ার কে ছোট একটা কাঠি দিয়ে পেটাতে পেটাতে গোটা পাড়া চষে ফেলতাম। সত্যি সে একটা সময় ছিল বটে! কখনো কুমির ডাঙ্গা, কখনো গোল্লাছুট, কখনো রুমাল চোর…এই সব খেলায় গমগম করতো বিকেল গুলো।

খেলার সঙ্গীরা এখন  যে যার মত নিজের নিজের জগতে ব্যস্ত। কখনো দেখা হয়, কথাও হয়ে মাঝে মধ্যে।  কিন্তু খেলার স্মৃতিটুকু রয়ে গেছে।

ছোটবেলার কয়েকটা খেলার কথা মনে করিয়ে হারিয়ে যাওয়া যাক আমাদের ফেলে আসা ছোটবেলায়।

লাট্টু

ছোটবেলার অত্যন্ত প্রিয় খেলাগুলোর মধ্যে এটি একটি। নতুন কেনা রঙিন লাটিম দিয়ে কাউকে হারিয়ে দেওয়ার যে সুখস্মৃতি, তা এখনো চোখে লেগে আছে। সুতোয় জড়িয়ে অনেকে হাতের মধ্যে লাট্টু ঘোরাতে পারত। আমাদের চোখে তারা ছিল হিরো।

সুপারিপাতার গাড়ি :

সুপারি বা নারকেল গাছের শুকনো পাতার গাড়িতে বসে আছেন আপনি। আর সামনে ধুলো উড়িয়ে সেটা টেনে নিয়ে ছুটছে আপনার বন্ধু। এখন গাড়িতে বসে সেসব দিনের কথা ভাবলে শিহরিত হয়ে ওঠে মন।

গুলি বা মার্বেল

কাচের ছোট্ গোলাকার কালচে সবুজ মার্বেল খেলেনি এমন বাচ্চা, বা কিশোর খুব কম ই আছে। আমরাও প্রচুর মার্বেল কিনতাম পাড়ার দোকান থেকে।

চোরপুলিশ খেলা :

চার টুকরো কাগজ। একেকটিতে নম্বরসহ লেখা ‘চোর’, ‘পুলিশ’, ‘ডাকাত’ আর ‘বাবু’। সেই কাগজগুলো ভাঁজ করে ছুড়ে দিতে হত। তারপর দারোগা-র পুলিশ কে হুকুম, চোর কে ধরে আনো। কে চোর হচ্ছে আর কেই-বা বাবু, সেটা নিয়ে অনেক সময় ঝগড়া বেধে যেতো।

কানামাছি

‘কানামাছি ভোঁ ভোঁ, যাকে পাবি তাকে ছোঁ’..

দুপুরের অবসরে এখনো কানে বাজে এই সুর, ফিরে যাই নির্মল শৈশবের দিনগুলোয়। একদঙ্গল ছেলেমেয়ে চোখ–বাঁধা কানামাছিকে ‘টুকি’ দিতে দিতে সুর করে গলা ছেড়ে গাইছে ‘কানামাছি ভোঁ ভোঁ, যাকে পাবি তাকে ছোঁ’।

 

এখনকার মোবাইল, ইন্টারনেট এর জুগে গ্রাম বাংলার এই খেলাগুলো হারিয়ে যেতে যেতে বিলুপ্তির পথে। হারিয়ে গেছে কাবাডি, গোল্লাছুট, খো-খো, কিত কিত, ওপেন টি বাইস্কোপ, রুমাল চোর। এভাবেই চুরি হয়ে গেছে শৈশব, এক্কা দোক্কার জায়গায় অনলাইন এ মোবাইল বা ট্যাব এর দিকে তাকিয়ে থাকা, গুগুল লিঙ্ক এ ছবি তুলে পিডিএফ এ পাঠানো এগুলোতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠছে নেক্সট যেন শৈশব। অনলাইন ক্লাস, স্কুল গুলোর এত পড়ার চাপ, প্রজেক্ট, এসেস্মেন্ট টেস্ট..এই সব সামলে খেলার সময় ই পায় না অধিকাংশ বাচ্চারা। করোনা আবহে প্রায় দুবছর ধরে স্কুলে যাওয়া বন্ধ বাচ্চাদের। অনলাইন ক্লাস ই তাদের ভরসা। কার সাথে মিশবে, দল বানিয়ে কিভাবে কিছু খেলতে হবে, সেটাও শিখতে হচ্ছে। করোনা আবহে বাচ্চাদের অনেকেই ভুলে গেছে তাদের স্কুল এ একটা বড় মাঠ আছে, সেখানে বন্ধুদের সাথে ছুটোছুটি, খেলাধুলো করা যায়। সেখানে নেই মা, বাবার বকুনি, নেই ক্লাস টিচার এর চোখ রাঙ্গানি।

 

সময়ের উপরে সময়ের প্রলেপ পড়তে পড়তে কত কিছু ফিকে হয়ে যায়, হারিয়ে যায়। কিন্তু শৈশব থেকে যায় রঙিন, অমলিন, চিরদিন…

 

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

19 − seventeen =