আজ বিরসা মুন্ডার জন্মজয়ন্তী, জেনে নেওয়া যাক আদিবাসী সম্প্রদায়ের এই নেতার বীরত্বের কাহিনী

This News is Presented by Shyam Sundar Jewellers

 দেবব্রত সেনগুপ্ত:

“চলো তুলেনিই তির-ধনুক আর কুঠার।
আজ আমাদের মরন প্রিয় জীবন বাজির অঙ্গীকার।
জমিদার মহাজন’ দোকানে বিদেশিদের ছাড়বোনা আর।
তারা আমাদের জমির দখলদার। “

This news is sponsored by STP Tax Consultant

আজও মুন্ডা সম্প্রদায়ের কাছে একটি প্রিয় গান। এই গান তাদের চেতনার, তাদের লড়াইয়ের, তাদের ঐতিহ্যের। এই গানের মধ্যে রয়েছে অত্যাচারের বিরুদ্ধে, কোম্পানির বিরুদ্ধে, গর্জে ওঠা বিরসা মুন্ডার নেতৃত্ব ও মুন্ডা সম্প্রদায়ের স্বাধীনতার লড়াই।

 

২৪ ডিসেম্বর ১৮৯৯ ইংরেজদের পুলিশ ফাঁড়ি দাউদাউ করে জ্বলছে, আর রাতের অন্ধকারে প্রাণ বাঁচিয়ে পালাচ্ছে ইংরেজ পুলিশ। সেদিন চলছিল উলগুলান- উলগুলান। অর্থাৎ বিদ্রোহ আর বিদ্রোহ।
বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে সুসংবদ্ধ ভাবে মুন্ডা বিদ্রোহ কাঁপিয়ে দিয়েছিল ইংরেজ রাজত্বের ভিত্তিপ্রস্তর। জমিদার থেকে শুরু করে লাঠিয়াল, সরকারি কর্মচারী, পুলিশ, মহাজন’,মিশনের সাহেব সবাই পালাচ্ছে প্রাণ হাতে করে। মুন্ডাদের হুংকারে কাঁপছে জঙ্গলমহল।

মুন্ডা সম্প্রদায়ের উপর অত্যাচারকারি বহিরাগত সমস্ত মানুষকে একযোগে আক্রমণ করে বিরসা বাহিনী।
এই প্রবল আক্রমণের মুখে মারা পরে কিছু ইংলিশ পুলিশ। পালিয়ে আত্মরক্ষা করতে সমর্থ হয় বেশ কিছু ইংরেজ পাদ্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদে নিযুক্ত ব্যক্তি। অনেকেই মুন্ডাদের তীরে আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যায়। ইতিমধ্যে রটে যায় যে, ৮ জানুয়ারি তারা রাঁচি আক্রমণ করবে। এতে সেখানে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।

পরবর্তী পর্যায়ে বিদ্রোহ দমনে নিযুক্ত হয় বিশাল পুলিশ এবং সৈন্যবাহিনী। শুরু হয় এক অসামঞ্জস্যপূর্ণ যুদ্ধ।
সৈন্যবাহিনী দূরবীন এর সাহায্যে বিপ্লবীদের অবস্থান লক্ষ্য করে। এরপর তাদের আত্মসমর্পণের জন্য আহ্বান করা হয়। কিন্তু জীবনপণ করে যুদ্ধে নামা সাধারণ মুন্ডা সম্প্রদায়ের মানুষেরা।

শুরু হয় কামান বন্দুক এর বিরুদ্ধে সাধারণ তীর ধনুক বর্ষার এক অসামঞ্জস্যপূর্ণ যুদ্ধ। বহু বীরযোদ্ধা শহীদ হন।
তৎক্ষণাৎ ধরা না পড়লেও পরবর্তী ক্ষেত্রে বিশ্বাসঘাতকদের মাধ্যমে ধরা পড়ে যায় আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ধরতি আবা- বিরসা মুন্ডা।

কথিত আছে ১৮৭৫ সালে ১৫ নভেম্বর বিরসা মুন্ডার জন্মের সময় আকাশে পুচ্ছযুক্ত তারা দেখা গিয়েছিল বৃহস্পতিবারে জন্ম— তার নাম রাখা হলো বিরসা। বয়স্ক ব্যক্তিরা, বলেছিলেন ‘ ধরতী আবা’ জন্ম নিয়েছেন।
বিরসা জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাঁশের তৈরি একটি কুঁড়েঘরে। চালকাডের পাশে উলিহাতু ও বম্বা, দুটি গ্রামই বিরসার জন্মস্থান হবার গৌরব দাবিকরে। বিরসার জন্মতিথির বিষয়েও ভ্রমপূর্ণ প্রচার রয়েছে। কিন্তু চার্চে ব্যাপ্টিসম নেবার সময় যে জন্মতিথি (১৫/১১/১৮৭৫) দেওয়া হয়েছিল পরে এই তারিখটাই সর্বজনস্বীকৃত হয়।

বিরসার শিশু বয়স কাটে অন্যান্য মুন্ডা শিশুদের মতই ছাগল চড়ানো অথবা ওই ধরনের কাজের মধ্যে। একটু বড় হলে তাকে পাঠানো হয় মিশনারি স্কুলে শিক্ষা লাভের জন্য। সেখানেই বিরসা মিশনারিদের কুরুচিকর মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করে। ফলে তাঁকে এস স্কুল ছাড়তে হয়। তীব্র ঘৃণার সাথে এসে বলে ওঠে “সাহেব সাহেব এক টপি”- অর্থাৎ প্রশাসনে নিযুক্ত নিগ্রহকারী কোম্পানির সাহেব এবং স্কুল চালানো মিশনারি পাদ্রী সাহেব একই রকম।

যুবক বয়সে বিরসা ঘোষণা করেন যে “সিঙ্গ বােঙ্গা” অর্থাৎ সূর্য দেবতা তাঁকে দিব্য শক্তি প্রদান করেছেন এবং এখন সে সবরােগীকে রােগমুক্ত করতে পারে। আরও জানায়- এবার তিনি খুব তাড়াতাড়ি মুণ্ডাদের বিদেশির বন্ধন থেকে মুক্ত করবেন। তিনি মুন্ডাদের নিজ ঐতিহ্য এবং ধর্মে প্রত্যাবর্তন করার আহ্বান জানান।

বিরসার অসাধারন ব্যক্তিত্ব সাহস,নতুন ধর্মীয় ভাবাবেগ এবং সম্মোহনী ক্ষমতা মুন্ডা সমাজকে প্রভাবিত করেছিলো। তিনি মুন্ডা সমাজের সংস্কারের জন্য কিছু নির্দেশিকা চালু করেছিলেন,

১। মুন্ডাদের মদ্যপান পরিত্যাগ করতে হবে ।

২। সুন্দর এবং নির্মল গ্রাম ও চরিত্র গঠন করতে হবে ।

৩। সর্বপ্রকার কুসংস্কার ত্যাগ করতে হবে ।

৪। ব্রাহ্মণদের মতো গলায় ‘জানে’ বাঁ পবিত্র সূত্র ধারণ করতে হবে।

বিরসা আসলে একই সঙ্গে মিশনারি এবং পুরোহিত শ্রেণির প্রভাব খর্ব করতে চেয়েছিলেন। তার অনুচরেরা তার বাণী গ্রামে গ্রামে প্রচার করতেন। একই সাথে বেগার খাটা নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়। ধর্মীয় চরিত্রের এই আন্দোলনে পরবর্তীকালে রাজনৈতিক ও ভূমিবিষয়ক আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়ে ১৮৫৮ সাল থেকেই খ্রিস্টান উপজাতীয় ভিনদেশী ভূস্বামী ও ‘বেথ বেগারি’-র বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। একে তাঁরা অভিহিত করে ‘মুল্কাই লড়াই’ অর্থাৎ জমির জন্য সংগ্রাম বিরসার অভীষ্ট উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা। জমির প্রকৃত মালিক হিসেবে মুন্ডাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। বিরসার মতে ইউরোপীয়দের প্রভাবমুক্ত পৃথিবীতেই শুধু মুন্ডাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এবং তারই জন্য দরকার মুন্ডারাজ।

কোম্পানি রাজ্যে বিরুদ্ধে এই তীব্র বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ পরবর্তী পর্যায়ে বনবাসী মানুষদের প্রতি তাদের ব্যবহারে পরিবর্তন আনে। এবং কিছু আইনের মাধ্যমে বনবাসী মানুষদের অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।

আদিবাসী সম্প্রদায়ের নেতা বিরসা মুন্ডা যিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁর জন্মজয়ন্তীকে জনজাতীয় গৌরব দিবস হিসাবে উদযাপন করা হচ্ছে।  কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, আজ থেকে প্রতি বছর নভেম্বরের ১৫ তারিখে বিরসা মুন্ডার জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে জনজাতীয় গৌরব দিবস উদযাপন করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

twenty + 11 =